সমাজ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা Definition of Social Psychology
সমাজ মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যা সমাজস্থ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কজাত আচরণের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করে। সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির আচরণ সমীক্ষাই সমাজ মনোবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। সমাজবদ্ধ মানুষ প্রতিনিয়ত নানা প্রয়োজনে একে অপরের সংস্পর্শে আসছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কার্যকারণভিত্তিক। এই কার্যকারণভিত্তিক পারস্পরিক সম্পর্কের নামই হচ্ছে মিথষ্ক্রিয়া (Interaction)। সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার ফলে প্রতিটি ব্যক্তির জীবন একটা বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করে। সমাজ মনোবিজ্ঞান সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণের বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন করে থাকে।
সাধারণভাবে বলা যায়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সকল দিক এবং সামাজিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে কোন আচরণ যা অন্যের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতেও বিদ্যমান সে সংক্রান্ত সার্বিক দিক নিয়ে যে বিজ্ঞান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করে তাকে সমাজ মনোবিজ্ঞান বলে।
মনোবিজ্ঞানী কিম্বল ইয়ং (Kimball Young) তাঁর Hand Book of Social Psychology' গ্রন্থে বলেন, "Social psychology 15 concerned with the study of the interactional processes of the human beings" অর্থাৎ, সমাজ মনোবিজ্ঞান মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়ার অধ্যয়নের সাথে সম্পৃক্ত।
সর্বোবিজ্ঞানী ক্রেচ এবং ক্রাচ ফিল্ড (Kretch and Crutchfield) এর মতে, "Social psychology is the science of the behaviour of the individual in society." অর্থাৎ সমাজ মনোবিজ্ঞান সমাজস্থ ব্যক্তির আচরণের বিজ্ঞান।
সার্জেন্ট এবং উইলিয়াম সন (Sargent and William Son) তাঁদের 'Social Psychology' গ্রন্থে বলেন, "Social psychology is the scientific study of persons as members of groups with emphasis on their social or interpersonal relationships."
অর্থাৎ, সমাজ মনোবিজ্ঞান গোষ্ঠীর সভ্য হিসেবে ব্যক্তির বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা; যে আলোচনার সমাজ ও ব্যক্তি এবং ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্বন্ধের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
বর্শাবিজ্ঞানী এইচ. বনার (H. Bonner) তাঁর 'Social Psychology' গ্রন্থে সমাজ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় বলেন, "Social psychology is the scientific study of the behaviour of human beings." অর্থাৎ, মানব আচরণের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নই হচ্ছে সমাজ মনোবিজ্ঞান।
মনোবিজ্ঞানী মরগান এবং কিং (Morgan and King) তাঁদের 'An Introduction to Psychology' গ্রন্থে বলেন, "Social psychology is the study of the effects of group membership upon individual behaviour."
অর্থাৎ, দলীয় সদস্য হিসেবে ব্যক্তির আচরণের উপর যে প্রভাব বিস্তার করে তার অধ্যয়নই হচ্ছে সমাজ মনোবিজ্ঞান।
শেরিফ এবং শেরিফ (M. Sherif and C. W. Sherif) তাঁদের 'Social Psychology' শীর্ষক গ্রন্থে সমাজ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় বলেন, "Social psychology is the scientific study of the experience and behaviour of the individual in relation to social stimulus situations."
অর্থাৎ, সামাজিক উদ্দীপনামূলক অবস্থার প্রেক্ষিতে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও আচরণের বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়নই হলো সমাজ মনোবিজ্ঞান।
উপরিউক্ত সংজ্ঞালোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি, সমাজ মনোবিজ্ঞান সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যক্তির মনোভাব, ভূমিকা, ব্যক্তিত্ব এবং আচরণবিধি সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন ও গবেষণা করে।
সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি Scope of Social Psychology
সমাজ মনোবিজ্ঞান একটি গতিশীল বিষয় বলে এর পরিধি ক্রমেই বর্ধিত হচ্ছে। ফলে সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি কতটুকু অর্থাৎ সমাজ মনোবিজ্ঞান কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তা নির্ণয় করা সহজসাধ্য নয়। মানুষের জীবনের সাথে জড়িত থাকে বিভিন্ন ঘটনা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সামাজিক পরিস্থিতির অহরহ পট পরিবর্তন চলতে থাকে।
আধুনিক জগতের মানুষের জীবনে বিচিত্র ঘটনার সমাবেশ হওয়ায় তার জীবনও পূর্বাপেক্ষা অনেক জটিল হয়ে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ব্যাপ্তি পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছেছে। সমাজ মনোবিজ্ঞানীকে এসব সামাজিক ঘটনার ও মিথস্ক্রিয়ার ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ করতে হয়।
তাই দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সমাজ মনোবিজ্ঞানের গবেষণা ক্ষেত্র। এমতাবস্থায় সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধিও ক্রমশ ব্যাপকতর হচ্ছে। এ কথাটি মনে রেখেই সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. সামাজিকীকরণ (Socialization): সমাজ মনোবিজ্ঞান ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ নিয়ে আলোচনা করে।
২. সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া (Social interaction) : ব্যক্তির সঙ্গে অন্যান্য ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সমাজ মনোবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্যবিষয়। ব্যক্তির অনুগ্রহণ করা থেকে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া শুরু হয় এবং ব্যক্তির সমস্ত জীবনব্যাপী তা চলতে থাকে।
৩. মানুষের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা (To search nature of man) : সমাজ মনোবিজ্ঞানকে সামাজিকীকরণ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সাথে জড়িত কতকগুলো আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হয়। যেমন- জীবসত্তা হিসেবে মানুষের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা, তার মৌল চাহিদা, এসব চাহিদা কিভাবে ব্যক্তিকে কাজে প্ররোচিত করে, কিভাবে মানুষ অন্যান্য চাহিদা অর্জন করে প্রভৃতি বিষয়ের স্বরূপ জানা সমাজ মনোবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
৪. গোষ্ঠীর আলোচনা (Discussion of groups): সামাজিক মিথস্ক্রিয়ারত ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই কোন না কোন গোষ্ঠীর সদস্য। গোষ্ঠীভুক্তির দরুন ব্যক্তির মনোভাব, আগ্রহ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হয় এবং মনোভাব, আগ্রহ প্রভৃতি দ্বারা ব্যক্তির আচরণ ও প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত হয়। কাজেই গোষ্ঠীর প্রকৃতি, গোষ্ঠীর শ্রেণীবিভাগ, গোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য, গোষ্ঠীর আচরণ, গোষ্ঠীর ভূমিকা প্রভৃতি সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়বস্তু।
৫. সামাজিক বংশগতি (Social heredity) : প্রথা, ঐতিহ্য, আচার-ব্যবহার, নৈতিকতার অনুশীলন, অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি যা ব্যক্তি সামাজিক উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে সেগুলো ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এগুলো সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়। এছাড়া সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা এবং মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিও সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়।
৬. ব্যক্তিত্ব ও সংস্কৃতি (Personality and culture) : কোন কোন সমাজ মনোবিজ্ঞানীর মতে, ব্যক্তিত্বই হলো সমাজ মনোবিজ্ঞানের মূল আলোচ্যবিষয়। সংস্কৃতির পার্থক্যের দ্বারা ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয় কিনা তা যথাযথ অনুধাবন করার জন্য বিভিন্ন রকম সংস্কৃতির আলোচনায় সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা মনোনিবেশ করেন। এছাড়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের উপর সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবও সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্যবিষয়।
৭. মনোভাব, জনমত, প্রচার (Attitude, public opinion, propaganda) : মনোভাবের উৎপত্তি ও পরিবর্তন, কুসংস্কার (Prejudice), জনমত ও প্রচারের মনস্তাত্ত্বিক উপাদান, জনমত পরিমাপের সমস্যা, গোষ্ঠীর গতিশীলতা (Group dynamics) প্রভৃতি সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্যবিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।
৮. সামাজিক ব্যাধি (Social diseases) বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি যেমন- অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব, কিশোর ও বয়স্ক অপরাধ, কর্ণবৈষম্য, গোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গোড়ামীপনা, হীনম্মন্যতা, আক্রমণাত্মক আচরণ, শিল্পে বিরোধ, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রভৃতি বিষয়েও সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা করে এবং এসব সমস্যা বা বিরোধ প্রশমনের পথ নির্দেশ করে থাকে।
৯. রাজনীতি ও নেতৃত্ব (Politics and leadership) : দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ফলপ্রসূ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞানিগণ নানাভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১০. প্রেষণা ও প্রত্যক্ষণ (Motivation and perception) : সামাজিক প্রেষণার সাথে সামাজিক প্রত্যক্ষণের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও সমাজ মনোবিজ্ঞানে আলোচনা করা হয়।
উপরিউক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও সমাজ মনোবিজ্ঞানে সামাজিক অগ্রগতির সাথে বিভিন্ন নতুন বিষয়ের অধ্যয়ন ও গবেষণা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, উক্ত বিষয়গুলো একে অপর থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয় এবং এসব কিছুর মূলে যে সাধারণ কথাটি বিদ্যমান তা হলো সমাজ মনোবিজ্ঞান সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যক্তির আচরণ অধ্যয়ন করে থাকে।
Tag: Defination of social psychology,scope of social psychology,সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি,সমাজ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা,মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান ১ম পত্র সাজেশন,মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান বিভাগ,মনবিদ্যা কাকে বলে,প্রেষণা কাকে বলে,প্রেরণা কাকে বলে,মনোবিজ্ঞান কী,মনোবিজ্ঞান কি,মনোবিজ্ঞান কি?,সমাজ মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান শিক্ষা,শিক্ষা মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান ২য় পত্র,মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ?,টাকা রোজগার করার মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা,ভালোবাসার মনোবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা,মনোবিজ্ঞানের অর্থ এবং সংজ্ঞা,মনোবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা দাও।,মনো বিজ্ঞান,মানুষের শিক্ষা সংক্রান্ত আচরণের বিজ্ঞানই হলো শিক্ষা মনোবিজ্ঞান,সমাজ বিজ্ঞান,৪)শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি আলোচনা করো?,সমাজকর্মের পরিধি,মনোবিজ্ঞান,সমাজবিজ্ঞানের পরিধি,শিক্ষামনোবিজ্ঞানের পরিধি,একাদশ শ্রেণির সমাজ বিজ্ঞান বই pdf,পৌরবিজ্ঞানের পরিধি,সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি,শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের প্রকৃতি,শিক্ষা মনোবিদ্যার পরিধি,শিক্ষা মনোবিজ্ঞান,৫) মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো?,দর্শনের সংজ্ঞা,এবং মনোবিজ্ঞানের সঙ্গা ও ধারণা আলোচনা করো?,৩)শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো?,
Rate This Article
Thanks for reading: সমাজ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও পরিধি - Definition Of Social Psychology and Scope, Stay tune to get latest Blogging Tips.
