হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জন্ম ও বাল্যকাল- Birth and Early Life of Muhammad (SM)
i. জন্ম : হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জন্ম হয় বসন্ত মৌসুমে ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ৫৭০ সালের ২৯ আগস্ট ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার প্রত্যূষে বিবি আমিনার গর্ভে। তাঁর জন্ম হয়েছিল সুবহে সাদিকের পর এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সোমবার দিনটি ছিল বরকতময়, সৌভাগ্যপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল। এ দিনে তিনি নবুয়ত লাভ করেন, হিজরত করেন, মিরাজে গমন করেন এবং ইন্তেকাল করেন।
ii. নামকরণ : দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন 'মুহম্মদ' বা প্রশংসিত এবং তাঁর মা নাম রাখেন 'আহমদ' বা চরম প্রশংসাকারী । দু'টি নামই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে তিনি মুহম্মদ নামে সমধিক পরিচিত।
তৎকালীন নিয়মমাফিক সর্বপ্রথম তাঁর মা সায়্যিদা আমিনা তাঁকে প্রায় সাতদিন দুধ পান করান। এরপর কয়েকদিন পর্যন্ত আবু লাহাবের দাসী সুয়ায়বা তাঁকে দুধ পান করান।
সে জামানার রেওয়াজ অনুযায়ী শহরের অভিজাত পরিবারের লোকেরা তাঁদের সন্তান-সন্ততিকে দুধ পান করানো এবং তাদের লালন পালনের জন্য গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দিতেন। সেখানকার খোলা আলো-বাতাসে স্বাস্থ্য ভালো হবে এবং সন্তানেরা বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখতে পারবে বলে তাঁরা মনে করতেন। কেননা আরবের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের ভাষা অধিকতর বিশুদ্ধ বলে ধারণা করা হতো। এই নিয়ম অনুযায়ী গ্রামের মেয়েরা শহরে এসে অভিজাত পরিবারের সন্তানদের লালন-পালনের জন্য সঙ্গে নিয়ে যেতো। তাই হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে হাওয়ায়েন গোত্রের কতিপয় মহিলা শিশুর সন্ধানে মক্কায় আগমন করেন। এঁদের মধ্যে হালিমা সা'দিয়া নদী এক মহিলাও ছিলেন । এই ভাগ্যবতী মহিলা কোন বড় লোকের শিশু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আমিনার ইয়াতীম শিশু সন্তানকে নিয়ে যেতে বাধ্য হন ।
iii. ধাত্রী হালিমার গৃহে অবস্থান ও বক্ষ বিদারণ : বিবি হালিমার গৃহে অবস্থানকালে হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জীবনে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। একদিন শিশু মুহম্মদ তাঁর দুধভাই ও অন্যান্য বালকদের সাথে মাঠে মেষ চরাচ্ছিলেন। এমন সময় দু'জন ফিরিশতা মুহম্মদ (স) এর বক্ষবিদারণ করে আত্মশুদ্ধি করে দেন। তায়েফের বনি সাদ গোত্রের বিবি হালিমার তত্ত্বাবধানে হযরত মুহাম্মাদ (স) পাঁচ বছর অতিবাহিত করেন।
iv. মাতৃ বিয়োগ : হযরত মুহাম্মাদ (স) এর বয়স যখন ছয় বছর, তখন বিবি আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় গমন করেন। স্বামীর কবর জিয়ারত এবং আত্মীয়দের সঙ্গে হযরত মুহাম্মাদ (স) এর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এই সফরে বের হন। মদিনায় তিনি প্রায় এক মাস কাল অবস্থান করেন। ফিরবার পথে আরওয়া নামক স্থানে বিবি আমিনা জ্বরে আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করলে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। আরওয়া থেকে উম্মে আইমান নদী এক মহিলা হযরত মুহাম্মাদ (স) কে মক্কায় নিয়ে আসেন এবং দাদা আব্দুল মুত্তালিবের নিকট পৌঁছে দেন।
v. দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানে : মায়ের মৃত্যুর পর হযরত মুহাম্মাদ (স) এর দেখাশোনার ভার দাদা (আ) মুত্তালিব গ্রহণ করেন। তিনি মহান কর্তব্য অতীব সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে পালন করেন। হযরত মুহাম্মাদ (স) এর আট বছর বয়সে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে দাদা আব্দুল মুত্তালিব মৃত্যুবরণ করেন।
আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর মক্কার শাসনভার ও হযরত মুহাম্মাদ (স) এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর চাচা আবু তালিব। তিনি নিজের ঔরসজাত সন্তানদের চেয়েও হযরত মুহাম্মাদ (স) কে বেশি আদর যত্ন করতেন। আবু তালিবের আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন হযরত মুহাম্মাদ (স) কে সংসারের বিভিন্ন কাজ করতে হতো। তবে সে সময় মাঠে মেষ ও উট চরানোকে অসম্মানজনক কাজ হিসেবে মনে করা হতো না। হযরত মুহাম্মাদ (স) আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও বিশ্বকে তিনি পাঠশালা হিসেবে নেন এবং প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেন।
হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আল-আমিন উপাধি লাভ
ছোটবেলা থেকেই হযরত মুহাম্মাদ (স) চিন্তাশীল ছিলেন এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি বিশেষ ঝোঁক দেখাতেন ৷ নিপীড়িত, অসহায় ব্যক্তিদের জন্য তাঁর মন সদা কেঁদে উঠত। তিনি ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদী ছিলেন। এ কারণে আরবের বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিরা হযরত মুহাম্মাদ (স) কে আমানতদার হিসেবে গ্রহণ করেন। নম্র ব্যবহার, সততা, সরলতা, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, প্রভৃতি কারণে তিনি আরববাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তাঁর প্রভূত কর্তৃব্যনিষ্ঠা, চরিত্র মাধুর্য, সরলতা, পবিত্রতা, সত্যের প্রতি অনুরাগ ইত্যাদি কারণে মক্কাবাসীগণ তাঁকে 'আল-আমীন' বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেন। পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি সমগ্র আরবে আল আমীন' হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি গোটা জীবন এ নামের সার্থকতা রক্ষা করেন।হরবুল ফোজ্জার ও হিলফুল ফুজুল বা শান্তিসংঘ
প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট দিনে আরবের বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত। এসব মেলার মধ্যে বিরাট ও প্রসিদ্ধ মেলা ছিল। 'ওকাজ মেলা'। নানা পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও কাব্য প্রতিযোগিতা, গান, ঘোড়দৌড়, জুয়া খেলা ইত্যাদি মেলায় হতো। একবার 'ওকাজ মেলা' হতে ভীষণ একটা যুদ্ধের সূচনা হয়। হাশেমীয় বংশের সাথে আরবের বিভিন্ন গোত্রও যোগ দেয়। এ যুদ্ধ পাঁচ বছর স্থায়ী হয়। এ যুদ্ধ কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে সংঘটিত হয়। হযরত মুহাম্মাদ (স) এর চাচা আবু তালিবের সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন বলে ঐতিহাসিকগণ মত প্রকাশ করেন। এ যুদ্ধকে অন্যায় বুদ্ধ বা হরবুল ফোজ্জার নামে অভিহিত করা হয়।এ যুদ্ধের ভয়াবহতা হযরত মুহাম্মাদ (স) কে বিচলিত করে তোলে। তিনি যেকোন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে সমাজ তথা মক্কাবাসীকে রক্ষা করার জন্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় আরবের কতিপয় উৎসাহী যুবক নিয়ে একটি শান্তি সংঘ গঠন করেন। এ শান্তি সংঘের সদস্যরা আল্লাহর নামে শপথ করে প্রত্যেকেই প্রতিজ্ঞা করেন-
i. আমরা অসহায়, নিঃস্ব ও দুর্গতদের সেবা করব।
ii. আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে অত্যাচারীকে বাধাপ্রদান এবং উৎপীড়িতকে সাহায্য করার।
iii. আমরা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করব, যাতে কোন ব্যক্তি বা গোত্র শান্তিভঙ্গের কারণ না হতে পারে।
iv. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করব।
V. কোন জালেমকে মক্কায় আশ্রয় দিব না ।
সম্ভবত পৃথিবীর বুকে এটাই সর্বপ্রথম শান্তি সংঘ ছিল। এ শান্তি সংঘ ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘ ৫০ বছর স্থায়ী ছিল। এ শান্তি সংঘের মাধ্যমে হযরত মুহাম্মাদ (স) তাঁর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।
Rate This Article
Thanks for reading: হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জন্ম ও বাল্যকাল- Birth and Early Life of Muhammad (SM), Stay tune to get latest Blogging Tips.
