সমাজ মনোবিজ্ঞান বিকাশের ইতিহাস -History of the Development of Social Psychology
সমাজ মনোবিজ্ঞান কে, কখন প্রতিষ্ঠা করেছিল তা নিশ্চিত করে বলা বেশ কঠিন। কেননা অন্যান্য বিজ্ঞানের ন্যায় সমাজ মনোবিজ্ঞানও কোন একটি বিশেষ দিনে কোন একক ব্যক্তি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় নি। যেহেতু বিজ্ঞান হিসেবে সমাজ মনোবিজ্ঞানের অবস্থান মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে অবস্থান করে সেহেতু সমাজ মনোবিজ্ঞানের উৎপত্তি ইতিহাসে দর্শন থেকে শুরু করে নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, বিবর্তনবান, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
বস্তুতপক্ষে নানাবিধ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এবং বিভিন্ন চিন্তাবিদদের অবদানে সিক্ত হয়ে মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের শেষের দিকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে সমাজ মনোবিজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটে। নিয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞানের উৎপত্তির ইতিহাসে বিভিন্ন ভাবধারার অবদান আলোচনা করা হলো :
দার্শনিকদের অবদান (Contribution of philosophers) :
প্রাচীন, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক দার্শনিকগণ তাঁদের বিভিন্ন রচনাবলিতে মানব প্রকৃতি, তাদের সহজাত প্রবৃত্তি, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা এবং সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধে অনেক ধারণা লিপিবদ্ধ করেছেন। প্লেটো, এরিস্টটল, হবস্, লক, রুশো এবং আরো অনেক সমাজ চিন্তাবিদদের লেখনীতে ফুটে উঠেছে মানুষের সামাজিক জীবনযাত্রার সমস্যা সম্পর্কিত নানাবিধ দিক।
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁদের মতামত পরস্পর বিরোধী হলেও তা সমাজবদ্ধ মানুষের এক একটা বিশেষ দিককে তুলে ধরেছে। তাঁদের চিন্তাচেতনা নিঃসন্দেহে মৌলিক ও মহান। বিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো কিছুটা অস্পষ্ট এবং অবৈজ্ঞানিক বলে মনে হলেও মানব প্রকৃতি বিশ্লেষণে তাদের চিন্তাধারা অনেক বেশি গৃহীত হয়েছে। সুতরাং সমাজ মনোবিজ্ঞানের উদ্ভবের পিছনে বিভিন্ন সমাজ চিন্তাবিদদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
নৃবিজ্ঞানীদের অবদান - Contribution of anthropologists
সমাজ মনোবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে নৃবিজ্ঞানীদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। সমাজের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার ক্ষেত্রে ই. বি. টেলর (E. B. Tylor) এর ১৮৭১ সালে প্রকাশিত 'Primitive Culture' গ্রন্থটি একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। গ্রন্থটিতে আদিম মানুষের বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার, মনোভাব প্রভৃতির সুসংগত বিশ্লেষণ দেখা যায়। এছাড়াও সমাজ মনোবিজ্ঞানের উৎপত্তির ইতিহাসে দু'জন প্রাচীন নৃবিজ্ঞানী স্টাইনথাল (Stenithal) এবং ল্যাজারাস (Lazarus) এর অবদান অনস্বীকার্য।
১৮৬০ সালে এই দুই জার্মান চিন্তাবিদ Journal of Folk Psychology' নামে একটি সাময়িকী বের করেন যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম, লৌকিক উপাখ্যান, শিল্পকলা ইত্যাদি পর্যালোচনার মাধ্যমে আদিম মানুষের মানসিক প্রক্রিয়াকে আবিষ্কার করা। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা দলীয় মন ( Group Mind) নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে পড়েন।
ফলে তাদের রচনা দর্শনের দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ে। তথাপি সমাজ মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এর একটি বিশেষ সুফল লক্ষ্য করা যায়। পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের জনক উইলহেম ঘৃত (Wilhelm Wundt) Journal of Folk Psychology যারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে দশ খণ্ডের Elements of Folk Psychology' রচনা করেন এবং তারই সূত্র ধরে নৃবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনে সচেষ্ট হন।
বিবর্তনবাদীদের অবদান - Contribution of evolutionists :
সমাজ মনোবিজ্ঞান উদ্ভবের ক্ষেত্রে চার্লস ডারউইনের (Charles Darwin) প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। ১৮৭১ সালে প্রকাশিত 'Descent of Man' গ্রন্থে ডারউইন মানুষের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করতে যেয়ে বিভিন্ন কৃষ্টিগত উপাদান যথা : ভাষা, সহযোগিতা, সমবেদনা, প্রশংসা, কুৎসা প্রভৃতির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural selection) কেবলমাত্র শারীরিক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও তা সমভাবে প্রযোজ্য।
ডারউইনের মতো হারবার্ট স্পেনসারও (Herbert Spencer) সমাজজীবনে বিবর্তনবাদের প্রয়োগ করেন। মানব চরিত্র বিশ্লেষণে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক (সামাজিক) ঘটনাবলির নিরবচ্ছিন্ন সামস্তস্য বিধানের মধ্যেই মানুষের জীবন রয়েছে চলমান। তাছাড়া ব্যক্তি কিভাবে গোষ্ঠীর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়। এবং গোষ্ঠীই বা কিভাবে একটি পূর্ণ জীব অঙ্গের ন্যায় রূপ নেয় তা তিনি ব্যাখ্যা করেন। স্পেনসারের মতে, বিবর্তন শুধু জীবজগতে নয়, সামাজিক পরিমণ্ডলেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়।
সমাজবিজ্ঞানের অবদান - Contribution of sociology :
সমাজ মনোবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীদের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন- সমাজবিজ্ঞানের জনক বলে খ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ Positive Philosophy (১৮৩০) গ্রন্থে বলেন, সমাজের মধ্যেই ব্যক্তি মনের বিকাশ এবং ব্যক্তিকে অবশ্যই তার সামাজিক পরিবেশের পটভূমিতে বিচার করতে হবে। বিজ্ঞান বিন্যাসে তিনি যে চূড়ান্ত বিজ্ঞানের কথা বলেছেন সেটি মূলত আধুনিক মনোবিজ্ঞান, বিশেষ করে সমাজ মনোবিজ্ঞানের সমান্তরাল। "কোঁৎ এর এই অবদানের প্রেক্ষিতে লিভজে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সমাজ মনোবিজ্ঞানের জনক হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করতে হলে কোঁৎই হবেন সেই দুর্লভ সম্মানের অধিকারী। "
সমাজ মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম (Emile Durkheim) এবং ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ভিলফ্রেডো প্যারেটোর (Vilfredo Pareto) অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। এমিল ডুরখেইম 'গোষ্ঠী চেতনা' তত্ত্বে গোষ্ঠী আচরণের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, গোষ্ঠী মনের (Collective mind) ধারণাটির অবতারণা করে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। সমাজ মনোবিজ্ঞানের পদ্ধতির ক্ষেত্রে ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী প্যারেটোর অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি মনে করেন যে, যুক্তিভিত্তিক পরীক্ষণ পদ্ধতির (Logico experimental method) মানব আচরণের পক্ষপাতহীন শ্রেণীবিভাগ সম্ভব। মানুষের কার্যাবলি বিশ্লেষণ করতে যেয়ে তিনি প্রেষণাকে দু'টি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা : ক. অভ্যন্তরীণ প্রেষণা বা রেসিডিউস (Residues) এবং বাহ্যিক প্রেষণা বা ডিরাইভেশান (Derivations) এসব ধারণার কতিপয় সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর রচিত The Mind and Society' (১৯১৬) গ্রন্থটি সমাজ মনোবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ( Max Weber) সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশের জন্য ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কারণকে দায়ী করেছেন।
সমাজ মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা - Founder of Social psychology
সমাজ মনোবিজ্ঞানের উৎপত্তির ইতিহাসে ফরাসি আইনবিদ ও বিচারক মেরিয়েল টার্ডে (Gabriel Tarde) এবং সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে ব (Gustave Le Bon ) প্রত্যক্ষভাবে অবদান রেখেছেন। The Laws of Imitation' গ্রন্থে অপরাধমূলক কার্যকলাপ পর্যালোচনা করতে যেয়ে তিনি বলেন, অনুকরণই হলো মৌলিক সামাজিক প্রক্রিয়া এবং এর সাহায্যে সামাজিক আচরণের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। যদিও টার্ডে অনুকরণের বিশ্লেষণ বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে পারেন নি তবুও তিনি প্রথম সমাজবিদ যিনি অনুকরণের মতো একটি মৌলিক সামাজিক প্রক্রিয়ার উপর ব্যাপকভাবে গবেষণা করেছেন।
তাঁর মতে, এক সমাজ অন্য সমাজকে অনুকরণ করে চলেছে এবং এ প্রক্রিয়ায় সামাজিক বিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। এভাবে সমাজ মনোবিজ্ঞানে তিনি সর্বপ্রথম সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার (Social interaction) প্রত্যয়টি যুক্ত করেন। ফলশ্রুতি শুরু হয় সমাজ মনোবিজ্ঞানের অব্যাহত যাত্রা। সেই যাত্রা আরো ত্বরান্বিত হয় গুস্তাভ লে ব কর্তৃক রচিত 'The Crowd' (১৮৯৫) নামক গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর। তাঁর মতে, জনতার আচরণে যুক্তির চেয়ে অভিভাবনের (Suggession) প্রভাবই বেশি। জনতার মধ্যে ব্যক্তি তার নিজস্ব সত্তাকে অনেকাংশে হারিয়ে ফেলে এবং আবেগ, প্রবর্তনা ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়। জনতার আচরণ সম্পর্কে তাঁর গবেষণা সত্যিই মৌলিক প্রকৃতির।
সমাজ মনোবিজ্ঞানের উদ্ভবের ক্ষেত্রে কুলে (C. H. Cooley) এর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর রচিত 'Human Nature and Social Order' (১৯০২) এবং 'Social Organization' (১৯০৯) গ্রন্থদ্বয় সমাজ মনোবিজ্ঞানের বিকাশে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচ্য। প্রথম গ্রন্থটিতে কুলে (Cooley) দেখিয়েছেন কিভাবে পরিবার, সামাজিক সংগঠন, খেলার দল ও পাড়ার মধ্য থেকে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধিত হয়। দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রাথমিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়াতে আধুনিক শিল্পযুগে ব্যক্তিত্বের উপরে কি প্রচণ্ড পরিবর্তন সংঘটিত হয়।
সমাজ মনোবিজ্ঞানকে তিনি দেখিয়েছেন সঙ্গতিপূর্ণ মানুষের ব্যবহারের এমন একটি বিজ্ঞান হিসেবে যা পারস্পরিক সাহচর্য এবং প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত। উইলিয়াম ম্যাকডুগাল সমাজ মনোবিজ্ঞানে সামাজিক আচরণের উপর মানুষের সহজাত এবং অযৌক্তিক প্রবৃত্তির প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
সামাজিক জীবন এবং পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা করতে যেয়ে তিনি অসংখ্য সহজাত প্রবৃত্তির ( Instinct) কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ জন্মসূত্রে সহজাত প্রবৃত্তিগুলো অর্জন করে এবং এগুলো সমাজজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তি আচরণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে। ম্যাকডুগালের সহজাত প্রবৃত্তি তত্ত্বকে জন ডিউই (John Dewey), জর্জ হারবার্ট মিড (George H. Mead), সি, এইচ কুলে (C H. Cooley) প্রমুখরা তীব্র সমালোচনা করলেও উইলিয়াম জেমস (William James ) ম্যাকডুগালের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞানকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেন।
বস্তুতপক্ষে সমাজ মনোবিজ্ঞানের আধুনিক পর্যায়ের সূত্রপাত হয় ১৯২৪ সালের দিকে। এ সময়ে এফ. এইচ. আলপোর্ট (F. H. Allport) সমাজ মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দলীয় বা সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তির আচরণই সমাজ মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। ১৯২০ এবং ১৯৩০ সালে কিম্বল ইয়ং (Kimball Young) এর সমাজ মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত দু'টি গ্রন্থ রচনা করেন এবং গ্রন্থ দু'টিতে তিনি মনোবৈজ্ঞানিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক মতবাদ এবং উপাদানগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি ব্যক্তিত্বের উৎপত্তি ও ক্রিয়া এবং সমষ্টিগত আচরণের আলোচনার মধ্যে একটা যুক্তিসঙ্গত ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছিলেন।
সমাজ মনোবিজ্ঞানকে আরো এক ধাপ আধুনিক পর্যায়ে পৌঁছান আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় গতিশীলতা গবেষণা কেন্দ্রের (Research center for group dynamics) প্রতিষ্ঠাতা কার্ট লিউইন। তাঁর প্রবর্তিত ক্ষেত্র মতবাদ (Field theory) সমাজবিজ্ঞানীদেরকে দল এবং তার অভ্যন্তরস্থিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ সম্পর্কে উৎসাহিত করে।
১৯৩০ সালে মরেনো (Morena) সামাজিকতা মাপনী (Sociometry) এবং মনো-অভিনয় (Psycho-drama) এই দু'টি পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। উভয় পদ্ধতি পারস্পরিক সম্পর্ক, দলীয় ভূমিকা, দলীয় কাঠামো ইত্যাদি সম্বন্ধীয় পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত হয় তা সমাজ মনোবিজ্ঞানের ফলিত দিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে।
সমাজ মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হলো মনোভাব। মনোভাব পর্যালোচনা এবং এতদসংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে আলপোর্ট (Allport) এবং খাস্টোনের (Thurstone) নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯২৯ সালে থার্স্টোন মনোভাব পরিমাপের একটি স্কেল উদ্ভাবন করেন যা সাম্প্রতিককালে সমাজ মনোবিজ্ঞানীদের কাছে বিভিন্নভাবে সমাদৃত হয়েছে। ১৯৩৫ সালে জর্জ গ্যালাপ (George Gallup ) American Institute of Public Opinion প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীকালে Gallup Poll হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং নির্বাচনী প্রচারাভিযান সংক্রান্ত বিষয়ে এর অধিকতর কার্যকারিতা দেখা যায়।
১৯৩০ সালে বোগারডাস (Bogardus) এমন একটি অভীক্ষা (Test) রচনা করলেন যার সাহায্যে সংস্কারের (Prejudice) পরিমাপ করা সম্ভব হয়। সেই সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে জি. ডবলু আলপোর্ট (G. W. Allport) রচনা করেন The Nature of Prejudice' এবং গারহার্ট সেনগার (Gerhart Saenger) রচনা করেন।
The Social Psychology of Prejudice'। উভয় গ্রন্থই সমাজ মনোবিজ্ঞানের বিকাশের পথকে ত্বরান্বিত করে। ১৯৫১ সালে জাহোডা (Jahoda) এবং অপর দুই সহ লেখক 'Research Methods in Social Relations' রচনা করেন যাতে সমাজ মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব অভিজ্ঞতামূলক প্রণালী বা রীতি প্রয়োগ করা হয়, তাদের অনেকগুলোরই ব্যাপক এবং নির্ভুল বৃত্তান্তের আলোচনা দেখতে পাওয়া যায়।
বর্তমানকালে শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে পারিবারিক কাঠামোতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই পারিবারিক সম্পর্ক, বিপথগামী আচরণ এবং অপরাধীদের চিকিৎসা, আন্তঃসাংস্কৃতিক শিক্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে এগিয়ে এসেছে UNESCO, PEACE, CORPS ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে দলীয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন সমস্যা, যেমন- চুক্তি সম্পাদন, ঝুঁকি গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হচ্ছে। এইভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রবাহিত চিন্তাধারা আধুনিক সমাজ মনোবিজ্ঞানকে একটি মৌলিক বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমাজ মনোবিজ্ঞানী মানব আচরণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং তা অনুধ্যানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির হাতিয়ার নিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছেন। আর এই এগিয়ে চলার ইতিহাসই সমাজ মনোবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের ইতিহাস। এভাবেই নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও অন্তর্ঘাত এবং বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক, মুদিনী সমাজ মনোবিজ্ঞানী প্রমুখদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অবদানে পূর্ণাঙ্গ স্বাতন্ত্রিক বিজ্ঞান হিসেবে সমাজ মনোবিজ্ঞান আবির্ভূত হয়েছে।
Rate This Article
Thanks for reading: সমাজ মনোবিজ্ঞান বিকাশের ইতিহাস -History of the Development of Social Psychology , Stay tune to get latest Blogging Tips.
